।।অ্যাসপ সর্পের ভিলেন গিরি  – ইতিহাস থেকে সাহিত্যে ।।

✍️ অরুণাভ রায়


খ্রীষ্ট পূর্ব ৩০ অব্দ।  অস্থির রাজনৈতিক অবস্থা  রোমান সাম্রাজ্যে। এক দিকে পুরো সাম্রাজ্যে একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথে জুলিয়াস সিজারের ভাইপো আর্থাভিয়ান আর অন্যদিকে আর্থাভিয়ানের সৎ বোন অক্টাভিয়ার স্বামী মার্ক অ্যান্টনি।  মিশরের সুন্দরী রাণী ক্লিওপেট্রার কুহকে  মার্ক অ্যান্টনি   ত্যাগ করলেন পত্নী অক্টাভিয়াকে। শেষ পর্যন্ত আর্থাভিয়ানের সৈন্যদের কাছে পরাজিত অ্যান্টনি আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার রাস্তা বেছে নেন সুন্দরী ক্লিওপেট্রাও।নিজের শরীরে ছেড়ে দিয়েছিলেন  অ্যাসপ নামের
বিষাক্ত সাপ। যার দংশনে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন বিশ্ব ইতিহাসের সবথেকে রহস্যময়ী নারী। যে ঘটনার ওপর অষ্টাদশ শতকের বিখ্যাত ইটালিয়ান চিত্রকর জিওভান্নি বাতিস্তা তিয়েপোলো death of cleopetra এঁকেছিলেন।

           কিন্তু আসল গোল বাঁধলো ক্লিওপেট্রার আত্মহত্যা নিয়েই। গ্রীক লেখক প্লুটারক থেকে শুরু করে শেকসপিয়র অব্দি সকলেই লাস্যময়ী ক্লিওপেট্রার মৃত্যুর জন্য দায়ী করেছে বেচারা আট ফুটের সাপটিকে ।কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিকরা মানতে নারাজ। মানেননি সর্পবিজ্ঞানিরাও। অবশেষে জার্মান ঐতিহাসিক ক্রিস্টোফার স্কোফের দীর্ঘ গবেষণার পর জানা গেলো কোনো সাপ নয় বরং, হেমলক , আফিং এবং একোনাইট এর মিক্সচার সেবন করে আত্মহত্যা করেন ক্লিওপেট্রা। “Poison, not snake, killed Cleopatra, scholar says – Cleopatra died a quiet and pain free death, historian alleges” নামক নিবন্ধটি প্রকাশ পেলে শাপগ্রস্ত সর্প যেন একটু হাফ ছেড়ে বাঁচে।

          তবে অ্যাসপ বরাবরই যেন লেখক কুলের চোখে একটু ভিলেন টাইপের।  শুধু প্লুটারকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। নীল নদের ধার ঘেঁষা অঞ্চলের এই গোখরো প্রজাতির সাপটিকে বলতে গেলে গোটা গ্রীক মিথলজিতেই কুখ্যাত করে রাখা হয়েছে ।গ্রীক কিংবদন্তির ভয়ঙ্কর রাক্ষসী মেডুসা। যার কাটা মাথা নিয়ে  বীর পারসিয়াস  গ্রীসের অভিমুখে উড়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই কাটা মাথা থেকেই দু ফোঁটা রক্ত নীচে পরে। আর সেই রক্ত থেকেই জন্ম হয় অ্যাসপ নামের সাপটির!
আবার এই সাপটিকেই মিশরের ফ্যারাওরা সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতীক হিসাবে গণ্য করত।

       মধ্যযুগে পশ্চিম ইউরোপে কাল্পনিক পশু পাখি নিয়ে লেখা রূপকথা বেশ জনপ্রিয়তা পায়। অন্য অনেক পশু পাখির মত অ্যাসপও ঢুকে পড়ে রূপকথার চরিত্রে ।কিন্তু এখানেও তার ঠাঁই হয় শয়তানী শক্তির প্রতীকী হিসাবে। গাল ভরা এক নামও পায় — হাইপানালিস। শুধু কিংবদন্তী বা রূপকথায় নয় , অ্যাসপকে অশুভ শক্তির প্রতীক হিসাবে দেখাতে  শেকসপিয়রও কোনো খামতি রাখেন নি। ওথেলো নাটকের তৃতীয় দৃশ্যে পত্নী ডেসডেমনার প্রতি ওথেলোর  ঘৃনাকে প্রকাশ করতে মহান নাট্যকার aspics tongues” phrase টি তৈরি করেন। আর তারই সাথে ইংরেজি সাহিত্যে পাকাপাকি ভিলেন হয়ে যায় সাপটি।

           বিংশ শতকের শুরুতে সর্পবিজ্ঞান (herpetology) বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। একদল শখের সর্প বিজ্ঞানী একদম উঠে পড়ে লেগে গিয়েছিল সবথেকে বিষধর সাপের খোঁজে ।হাইড্রোফিস বেলচেরি বা অস্ট্রেলিয়ান তাইপেন তখনও সেভাবে লাইম লাইটে আসে নি। ব্যুম স্ল্যাং তো পুরোই অপরিচিত এক নাম। ব্ল্যাক মাম্বা বা গীবন ভাইপার নিয়ে একটু আধটু লেখালিখি চলছিল। কিন্তু মিথলজিতে এদের কে কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয় নি। সুতরাং  সর্প পন্ডিতদের একাংশ শেকসপিয়র আর গ্রীক কিংবদন্তীর ওপর নির্ভর করে অ্যাসপকেই সর্প রাজ ঘোষনা করে দেয়। LD 50 টেস্ট করে বিষের তীব্রতা মাপার টেকনিক তখনও অজ্ঞাত।যদিও খুব বেশিদিন সেই শিরোপা  মিশরীয় কোবরার মাথায় ছিল না।

       অ্যাসপের প্রাকৃতিক আবাস সাহারা মরুভূমি অঞ্চলে।যদিও উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকার প্রায় সব দেশেই এই সাপ দেখতে পাওয়া যায়।
লম্বায় বড় জোর সাড়ে আট ফিট।  
কুচকুচে কালো , হালকা তামাটে, ক্রিম সাদা, হলুদ বাদামী, ধূসর, নীল ধূসর  বাদামী এরকম বিভিন্ন বর্ণের অ্যাসপ উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দেখতে পাওয়া যায়। আফ্রিকার অত্যন্ত বিষধর সাপের তালিকায় রাখা হলেও বাস্তবে অ্যাসপ ব্ল্যাক মাম্বা বা কিং কোবরার মতন আক্রমণাত্মক স্বভাবের নয়। Fatality rate কে যদি সামনে রাখলে পাফ অ্যাডর, ব্ল্যাক মাম্বা, রাসেল ভাইপার, ব্লু ক্রেট জাতীয় সাপেদের তুলনায়
অ্যাসপ নেহাৎই নিরীহ।

Courtesy
a) “Poison, not snake, killed Cleopatra, scholar says – Cleopatra died a quiet and pain free death, historian alleges” – Melissa Gray
b)Did Cleopatra Really Die by Snake Bite? – Sarah Pruitt
c)”Who Was Cleopatra? Mythology, propaganda, Liz Taylor and the real Queen of the Nile” – Amy Crawford
d) Cleopetra and her asp – Margaret Simpson
e)Egyptian Cobra, the mythical and deadly asp – Snake Facts